ধর্ষণের মহামারি ও সামাজিক বাস্তবতা
ইদানিং আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনা পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে। ফলে নাগরিক সমাজ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের শাসন না থাকা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ অনেক কারণেই ধর্ষণ আজ মহামারি রূপ নিয়েছে। কোনোভাবেই যেন এ মহামারি থামতে চাই না।
এদিকে সমাজের নানা স্তরের মানুষ ধর্ষণের মতো অপরাধ নির্মূলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তাদের অনেকেরই দাবি, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার বিধান সংযুক্ত করার কথা ভাবছে।
ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে কী হবে?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলে সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মূল করা যাবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? চলুন, আমাদের দেশের আইন কী বলে একটু দেখে আসি।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯(১) অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ধারা ৯(২) অনুযায়ী ধর্ষণের ফলে নারী কিংবা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষকের সাজা যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ড, এবং ধারা ৯(৩) অনুযায়ী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে প্রত্যেককেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।
তার মানে হলো নতুন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। যদি এই আইনের সঠিক প্রয়োগ করা যেত, প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যেত এবং দ্রুত বিচার করার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে খুব সহজেই ধর্ষণের হার কমে যেত।
মৃত্যুদণ্ড কি যথার্থ শাস্তি?
অনেকে মনে করেন, ধর্ষণের পর মারা গেলে কেন মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে? বরং ধর্ষণ করলেই মৃত্যুদণ্ড বিধান করতে হবে, তাহলে ধর্ষণ কমে যাবে। দাবি অবশ্য করাই যায়, কিন্তু আমাদের কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে এই দাবি করার আগে—
- শুধুমাত্র ধর্ষণ কি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো অপরাধ কি-না?
- আমরা কি এমন বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলছি, যেটা শুধুমাত্র শাস্তি বিধান করে?
- আমরা কি ধর্ষণমুক্ত সমাজ চাই, নাকি ধর্ষকদের ফাঁসি চাই?
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ তার মানে আমরা চাইলেই কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নিতে পারি না। তবে আইন যদি চায়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, কানাডা, রাশিয়াতেও শুধুমাত্র ধর্ষণের অপরাধে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান নেই। এইসব দেশগুলোতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ড
শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া স্পষ্টভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অমানুষিক কিংবা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। মানবাধিকার সম্পর্কিত ইউরোপীয় কনভেনশনের ৩ অনুচ্ছেদে নির্যাতন, অমানবিক আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি সেটা অপরাধীদের ক্ষেত্রেও নয় এবং যুদ্ধের সময়েও নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মৃত্যুদণ্ডকে মানবাধিকারের চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে। এটি কেবল জীবনের অধিকারকেই লঙ্ঘন করে না, বরং নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণের শিকার না হওয়ার অধিকারকেও লঙ্ঘিত করে।
ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে নতুন যে সমস্যা সৃষ্টি হবে
যদি ধর্ষণের ফলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়, তাহলে ধর্ষিতার জীবন সংকটে পড়বে এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার হার বেড়ে যাবে। কোনো ধর্ষকই চাইবে না ধর্ষণের একমাত্র সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখতে। ধর্ষণের একমাত্র সাক্ষী মৃত্যুবরণ করলে ধর্ষককে শনাক্ত করা কঠিন হবে এবং অনেক সময় বিচার ব্যাহত হবে।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও সামাজিক সমাধান
বিচার ব্যবস্থার কাজ কি শুধুই শাস্তি বিধান করা? নাকি সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সঠিক পথ দেখিয়ে দেশ ও জাতিকে সাফল্যমণ্ডিত করা?
আমরা এমন একটি বিচার ব্যবস্থা চাই যেখানে শাস্তি বিধানের চাইতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বেশি থাকবে। তাহলেই সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সহজ হবে।
আমরা কী চাই—ধর্ষণমুক্ত সমাজ নাকি ধর্ষকদের ফাঁসি?
ধর্ষকদের ফাঁসি দিলে কি ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে? যদি তাই হতো, তাহলে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতো আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। ধর্ষকদের ফাঁসি দিলে কেবল ধর্ষকরা মারা যাবে, কিন্তু ধর্ষণের অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব না। কারণ পুরনো ধর্ষকদের জায়গা নতুন ধর্ষকরা দখল করবে।
তাই আমাদের এমন সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে যেখানে ধর্ষকদের ফাঁসি দিতে হবে না, বরং নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ থাকবে সবার। মেয়েরা রাস্তায় ভীতি নিয়ে চলবে না, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থাকবে না। এর জন্য আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে এবং আকাশ সংস্কৃতি পরিহার করে নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি লালন করতে হবে।
সর্বোপরি, অদূর ভবিষ্যতে ধর্ষণমুক্ত সমাজের প্রত্যাশা করি।